রবীন্দ্র লেখনীতে নারী
- ankurantareep1974

- Mar 20, 2019
- 2 min read

“আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা
তুমি আমারই, তুমি আমারই মম জীবন-মরণ বিহারী...”
শাস্ত্রে নারীকে বলা হয় ‘পূর্জাহা গৃহদীপ্তয়’... রবীন্দ্রনাথ নারীকে গৃহলক্ষ্মীর আসনে না বসিয়ে করেছেন পুরুষের হৃদয়েশ্বরী... তৎকালীন সমাজে নারীর অধিকার যখন অকল্পনীয়, তখন তিনিই তাঁকে করেছেন নিজের লেখনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র... রবীন্দ্রনাথের পুর্বে সেইঅর্থে কেউ বোধহয় নারীকে আত্মস্বতন্ত্রমতি করে প্রকাশ করেন নি... তুলির টানে তিনি এঁকেছেন নারীকে... কখনও সেই নারী সুখে বহুবর্ণা উজ্জ্বল... কখন সে দুঃখে সাদাকালো মলিন... মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ নারীর সবলা চরিত্র এঁকেছেন তাঁর গল্প, কবিতা, উপন্যাসে... নারী স্বাধীনতা কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে তাঁর লেখনী অন্যরকম... রবীন্দ্রনাথের নারী কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সমাজে আধুনিকতার প্রোজ্জ্বল দ্যুতি...
‘স্ত্রীর পত্রে’-র মৃণালের আছে নারীর সামাজিক স্বাধীনতার রূপ... একই রূপে আমরা পাই ‘সমাপ্তির’ মৃন্ময়ীকে, ‘ল্যাবরেটারির’ সোহিনী কিংবা ‘শাস্তির’ চন্দরাকে... ‘শেষের কবিতার’ লাবণ্য একাধারে মুক্ত, স্বাধীন এবং আত্মনির্ভরশিল... আবার এই রবীন্দ্রনাথই ‘নৌকাডুবিতে’ সনাতন ধারার পথিক... প্রেমের উপলব্ধি ছাড়া আমারা যে অসম্পূর্ণ সেটা রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ থেকে ‘গোরা’ তুলে ধরেছেন এবং তার উত্তরণ ঘটেছে ‘ঘরেবাইর’, তথা ‘চতুরঙ্গে’... রবীন্দ্র সৃষ্ট এই ‘স্ত্রীর পত্রের’ মৃণালের মধ্যে কোথাও কি ইবসেনের ‘ডলসহাউজের’ নোরা আছে... হয়তবা ‘যোগাযোগের’ কুমুর মধ্যে নোরা মিশে আছে... রবীন্দ্র বিশ্বাসে ...
“রমণীর মন/সহস্র বর্ষেরই/সাধানার ধন...”
রবীন্দ্রনাথের সেই সময়ের নারীদের কষ্ট, ব্যাথা-যন্ত্রনা বাস্তববাদী চোখ দিয়ে দেখেছেন... তিনিই আবার ভবিষ্যতের নারীর রূপ আগাম দেখেছেন... রবীন্দ্রনাথ নারী শিক্ষার কথা বলেছেন... বাল্যবিধবার বিপক্ষে গিয়ে বিধবা বিবাহের পক্ষে কথা বলেছেন... তিনি বাঙালি নারীদের একটা সম্ভাব্য প্রজন্মকে করলেন বুদ্ধিমতী, সৎ, নির্ভিক, আত্মত্যাগী ও প্রতিবাদী... ‘মানভঞ্জনের’ গিরিবালাও বোধহয় কোথাও নোরা... ‘কঙ্কাল’ গল্পে আছে বাল্যবিধবার প্রকট রূপ... ‘মহামায়ার’ মহামায়া ‘দৃষ্টি দিব্যলোকের ন্যায় উন্মুক্ত এবং নির্ভীক’... ‘দেনাপাওনা’ যৌতুক ও পণপ্রথা নিয়ে লেখা সম্ভবত প্রথম বাংলা সাহিত্য... তীব্রতা আরও প্রখর ‘অপরিচিতার’ কল্যাণী... ‘রক্তকরবীর’ নন্দিনী প্রাণ ও ভালোবাসার প্রতিক... বিশুপাগল নন্দিনীর চোখের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেয়ে ওঠে...
“ভালোবাসি ভালোবাসি
এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি...”
লেখনী এবং বাস্তব জীবনে কবি কি ভিন্ন? বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে যেখানে তাঁর লেখনী গর্জে ওঠে, ঠিক সেখানেই নিজ কন্যা মাধুরিলতার বিবাহ তিনি দেন ১৪ বছর বয়সে... মেজ মেয়ে রেণুকার বিয়ে দেন ১০ বছর বয়সে... পণপ্রথার বিরুদ্ধাচার করে নিজে কন্যার বিবাহে পণ দিয়েছেন তথা নিজ খরচে জামাতাদের বিদেশে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছিলেন... নারী শিক্ষার কথা বলেছেন... ঠাকুরবাড়ির অনেক মেয়েই বিদেশে গিয়ে শিক্ষা লাভ করলেও রবীন্দ্রনাথের নিজের মেয়েরা কিন্তু ভারতীয় শিক্ষা পর্যন্ত পায় নি... তিনি শান্তিনিকেতনে কেন নারী শিক্ষা দেননি?... বিধাবা বিবাহের সমর্থন তিনি করতেন না অথচ রবীন্দ্রনাথ নিজে কিন্তু বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তারই বিধবা বউয়ের বিয়ে আটকে দিয়েছিলেন... তথাপি বলি...
“তোমাকে করেছি জীবনের ধ্রুবতারা,
এ সমুদ্রে আর কভু হবো না কো পথহারা...”




Comments